মা ____সুমাইয়া_আমান_নিতু

 

সুমাইয়া আমান মিতু পরিচিতি :

মা

____সুমাইয়া_আমান_নিতু

জিনিসপত্র বুঝিয়ে দিয়ে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা অসম্ভব সুদর্শন লোকটি বললেন, "আপনার আর কিছু লাগলে এখনই বলুন।"

আমি একটু হেসে বললাম, "যা এনেছেন সেগুলোই প্রয়োজনের অতিরিক্ত।"

"তবুও যদি লাগে..ওহ! আপনার কাছে ছাতা আছে?"

"জ্বি না।"

"আমি দেখছি এখানে পাওয়া যায় কি না। যদিও বৃষ্টি নেই, তবু বাদলার দিন। ওখানে কী অবস্থা কে জানে...এখানে ছাতা পাওয়া যাবে কি না তাও জানি না...."

লোকটা বিড়বিড় করতে করতে চলে গেলেন সামনে থেকে।

পড়ুন: বান্ধবির মায়ের সাথে সম্পর্ক 

এদিকে আমার পাশে বসা ভদ্রমহিলা অবাক হয়ে কান্ড দেখছিলেন। লোকটা চলে যেতেই মহিলাটি জিজ্ঞেস করলেন, "তোমার স্বামী তোমারে আপনি কইয়া ডাকে ক্যান?"

"উনি আমার স্বামী নন।"

"তাইলে কী?" মহিলার চোখে ঘোরতর সন্দেহ।

আমি হাসলাম। বললাম, "উনার এত যত্ন দেখে বিভ্রান্ত হবেন না। উনি যা করছেন, তারচেয়ে ঢের বেশি আমি তার জন্য করছি।" 

বলে উঠে পড়লাম। কিছুদূর এগিয়ে পেছনে তাকিয়ে দেখলাম মহিলা হা হয়ে আছেন। তবে তার চেহারা একরকম তৃপ্তি ভাব আছে। এর মানে তিনি যা সন্দেহ করেছিলেন ঠিক হয়েছে। আমার মতো মোটামুটি চেহারার একটা মেয়ে এই লোকের বউ হতেই পারে না। নিশ্চই পরকীয়া প্রেমের কেস! আমি হাসলাম মনে মনে।

পড়ুন : প্রিয়জন

লোকটাকে দেখা যাচ্ছে। রেলস্টেশনে ছাতা পাননি তিনি। মুখটা গম্ভীর। আমি জিজ্ঞেস করলাম, "ছাতা পাওয়া যায়নি?"

তিনি মাথা নাড়লেন। আমরা একটু পর ট্রেনে উঠে বসলাম। ফার্স্ট ক্লাস একটা কামরা রিজার্ভ করা হয়েছে আমার জন্য। প্রথম এরকম একা একা শান্তিতে যাব ভাবতেই অবাক লাগছে৷ ট্রেন ছাড়ার আগ পর্যন্ত উনি বসে রইলেন আমার সাথে। ট্রেন ছাড়ার সময় হলে নেমে পড়লেন। জানালার সামনে এসে আবারও বললেন, "নিজের খেয়াল রাখবেন।"

আমি মুচকি হেসে বলি, "রাখব।"

"ফোন খোলা রাখবেন সবসময়।"

"রাখব।"


ট্রেন ছেড়ে দিল। ব্যাগ খুলে দেখলাম একগাদা ফলমূল। সুন্দর করে কেটে বক্সে ভরে দিয়েছে। এক বক্স ডেইরী মিল্ক চকলেট আর অনেকগুলো আচারের প্যাকেট। জামাকাপড়ের মধ্যে একটা গায়ে দেয়ার চাদরও আছে। এই গরমে চাদর গায়ে দেয়ার কথা ভাবতেই হাসি পেয়ে গেল। 


একটু পরেই ফোন এলো। ওপাশ থেকে নারীকন্ঠটি বলল, "কেমন আছ দিদি?"

"ভালো।"

"সব ঠিকঠাক আছে?"

"হ্যাঁ। আপনি ভালো?"

"আমার কথা ছাড়ো। তুমি ভালো থাকলেই আমি ভালো।"

আমি হাসলাম। উনি রেখে দিলেন। আমার সাথে তার কথা হয় এতটুকুই।


লোকটার নাম অনিরূদ্ধ চ্যাটার্জি, তার স্ত্রী বিশাখা চ্যাটার্জি। আর আমি সাগরিকা রহমান, তাদের অনাগত সন্তানের সেরোগেট মাদার। অদ্ভূত হলেও কান্ডটা সত্যি হচ্ছে। পৃথিবীর লোকের চোখ এড়িয়ে এক নতুন পৃথিবীর জন্ম দিতে যাচ্ছি আমি। 


প্রায় একত্রিশ বছর আগে ১৯৭৮ সালের ২৫ জুলাই লন্ডনের ওল্ডহ্যাম জেনারেল হসপিটালে পৃথিবীর প্রথম টেস্টটিউব বেবী লুইস ব্রাউনের জন্ম হয় ডাক্তার প্যাট্রিক স্টেপটো এবং রবার্ট এডওয়ার্ডের নেতৃত্বে।


তারপর থেকে পৃথিবীব্যাপি ছড়িয়ে পড়ে এই পদ্ধতি। বাংলাদেশেও ২০০১ সালে এই পদ্ধতিতে তিনটি কন্যা সন্তানের জন্ম হয়। এখন সবক্ষেত্রে না হলেও অনেক দম্পতিই এই ব্যবস্থা নেন।


আমার সেরোগেট মা হওয়ার গল্পটা খুব একটা আকর্ষনীয় নয়। আমি সাধারন ঘরের মেয়ে৷ মা মারা গেছে ছোটবেলায়। স্কুলমাস্টার বাবার সাথে কেটে গেছে ছোটবেলা। গ্রামের কাছের একটা ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি থেকে অর্থনীতিতে অনার্স পাস করেছি। বাবা রিটায়ার হলেন, সংসার তখন চলে না এমন অবস্থা। আমি সদ্য অনার্স পাস। চেষ্টা করতে লাগলাম চাকরির। ঢাকায় একটা মোটামুটি মানের চাকরি পেয়েও গেলাম। হিসেব করে দেখলাম এতে আমার ঢাকায় থাকা খাওয়া আর বাবার জন্য পাঠানোর কিছু টাকা হয়ে যাবে। তখন থেকেই ঢাকায় থাকা শুরু।


আমার বিয়ে হয়নি। বাবা বিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেননি তা নয়। তবে আমাকে কেউ পছন্দ করে ঘরে তুলে নেয়নি। না নিলে কি জোর করে দেয়া যায়? শ্যামলা, ছোট চোখ, হাইটে খাটো একটা মেয়েকে এক দেখায় কারো পছন্দ করার কথাও নয়। যারাও বা রাজি হয়েছে, চেয়ে বসেছে সেই আদ্যিকালেন নিয়মমতো ধনুক ভাঙা পণ! বাবার পক্ষে তা দেয়া সম্ভব ছিল না কোনো কালেই। তাই আমারও আর বিয়েটা করা হয়ে ওঠেনি।


ভালোই ছিলাম এখানে। তিনমাস পর পর বাবার সাথে দেখা করতে যেতাম। প্রতি ঈদে বাবার গায়ে নতুন পাঞ্জাবি দেখতে পেতাম। সেই আমার জীবন ছিল।


নিজের কিছু হলো না এ বিষয়ে আফসোসের থেকে বেশি আমার এটা আফসোস হতো যে পৃথিবীর কোনো কাজে লাগতে পারলাম না। শুধু শুধুই একটা মানুষের জন্ম হলো, সে আলো বাতাস নিলো, দু'চোখ ভরে পৃথিবীর সৌন্দর্য গিলল, তারপর মরে গেলো! একথা ভাবলেই কষ্ট হতো, কল্পনা করতাম একদিন কিছু করব এই পৃথিবীর জন্য, দুপেয়ে মানুষগুলোর জন্য। 


একদিন সুযোগ পেয়েও গেলাম। এক কলিগের সাথে হাসপতালে গিয়েছিলাম। সেখানেই চ্যাটার্জি দম্পতির সাথে দেখা। ভীষন হৈ হুল্লোড় আর কান্নাকাটি করছিলেন মহিলা। খুব ফর্সা গোলগাল মহিলাটি। কাঁদতে কাঁদতে নাক, কান, গাল রক্তিম হয়ে আছে। আর চোখের কোলে থাকা পানিগুলো সত্যিকারের মুক্তোর মতো জ্বলজ্বল করছে। খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম তারা একজন মেয়ে খুঁজছেন তাদের বাচ্চার জন্ম দেয়ার জন্য। টেস্টটিউব বেবী সম্পর্কে শুনেছিলাম। সেদিন ভালোভাবে জানলাম। কী মনে করে তাদের ফোন নম্বরও নিয়ে এলাম। বাসায় ফিরে অনেক ভেবে সিদ্ধান্ত নিলাম আমি সেরোগেট মাদার হব। পৃথিবীর এক দম্পতির মুখে হাসি ফুটিয়ে মরতে পারলেও জীবনের ঋণ কিছুটা শোধ হবে হয়তো।

 

আমি বাচ্চা গর্ভে ধারণ করার বিনিময়ে কিছুই চাইনি। এক টাকাও নেব না সে আগেই বলে দিয়েছি। শুধু দুটে শর্ত ছিল। এক এর মাঝে একবার বাবাকে দেখতে যাব। আর আমি তাদের বাড়িতে থাকব না। তারা ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে রাজি হয়ে গেল। দীর্ঘ পরীক্ষা নিরীক্ষার পর আমি গর্ভবর্তী হলাম। সে রাতটা উত্তেজনায় ঘুমাতে পারিনি। বাবাকে জানাইনি কিছু। তিনি এমনিতেই অসুস্থ।


এখন আমি বাড়ি যাচ্ছি। কুমিল্লা। বাবার অন্তিম সময় চলছে। গতরাতে অবস্থা খারাপ হয়ে গিয়েছিল। আমি গিয়ে জীবিত দেখতে পেলেই হয়। বাবার কথা ভাবতেই চোখে পানি চলে এল। বাবা! সারাজীবন আমাকে সুখী না করতে পারার কষ্ট নিয়েই রইল। তার এই কষ্ট দূর করার সাধ্যি যে আমার নেই!


হুট করে পেটে প্রচন্ড ব্যথা পেলাম। ব্যথাটা ছড়িয়ে পড়ল যেন সারা তলপেট জুড়ে। আমি দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করলাম ব্যথা। অস্থায়ী যন্ত্রণা চলে যেতেই একটা সুখানুভূতি ছড়িয়ে পড়ল মনে। বাচ্চাটা লাথি মেরেছে। ছেলে বাবু। একটু বেশিই দুরন্ত হবে বুঝি। কে জানে কেমন হবে! হয়তো বড় হয়ে মস্ত ক্রিকেটার হবে। সাকিবের মতো অলরাউন্ডার। নয়তো ডাক্তার হবে। নয়তো এস্ট্রোনট হবে। ঘুরে বেড়াবে পৃথিবীর বাইরে মহাকাশ জুড়ে। যে পা দুটো সারা মহাকাশ বিচরণ করবে সে এখন আমার ছোট্ট পেটে গুটিশুটি হয়ে নিরাপদে ঘুমিয়ে আছে। ভাবতেই শিহরন বয়ে গেল শরীর জুড়ে।


এলোমেলো চিন্তা করতে করতে তন্দ্রার মতো এসে গেল। আধো ঘুম আধো জাগরনে এক অদ্ভূত ছায়ার মতো স্বপ্ন দেখলাম। ঘুম ভেঙে মনে হলো আহা! স্বপ্নটা যদি সত্যি হতো! বাচ্চাটা যদি আমার কাছেই থেকে যেতো চিরকাল! সেই অযৌক্তিক চিন্তাটা আমি ঝেড়ে ফেলতে পারলাম না। গেড়ে বসে রইল মনে। আচ্ছা আমি যদি গন্তব্যে না পৌঁছে অন্য কোথাও নেমে যাই? দূরে চলে যাই? তাহলে তো বাবুকে কেউ আমার থেকে আলাদা করতে পারবে না। আমার নিজের একটা সংসার হবে। সদস্য আমি আর বাবু। 


আরও কত জল্পনা কল্পনা! ঘোরের মাঝে চলে গিয়েছিলাম। ট্রেন একটা স্টেশনে এসে থামতে বাস্তবে ফিরে এলাম। কত লোক, কত কত গন্তব্য আর কোলাহলের ভিড়ে হারিয়ে গেল ছোট্ট সুখস্বপ্নটি।


বাড়ি পৌঁছে দেখলাম বাবার অবস্থা বেশ খারাপ। নিঃশ্বাস নিতে পারেন না। বাড়ি প্রতিবেশী আর আত্মীয়তে ভর্তি। আমার প্রেগনেন্সি চলছে ছয় মাসের। গর্ভবর্তী হওয়ার পরপরই শরীরে পানি এসেছে বলে বেশ স্বাস্থ্যবান দেখায় আমায়। বড় হওয়া পেটটা আলাদা করে চোখে পড়ে না। তার ওপর চাদরটা ভালো করে জড়িয়ে নিয়েছি জ্বরের অযুহাতে। তবু যে দেখছে সেই বলছে, তুই ভীষণ মোটা হয়েছিস। স্বাস্থ্য কমা। দেখতে বিচ্ছিরি লাগে!


বাবা মারা গেলেন আমার হাতের ওপর। কষ্টটা দলা পাকিয়ে আসলো ভেতরে। মাথাটা ফাঁকা। পৃথিবীতে আর কেউ রইলো না এই অভাগীর। মরে গেলেও  যার জন্য কাঁদার মতো কেউ নেই তার হতো হতভাগ্য বুঝি কেউ নেই।


চ্যাটার্জি দম্পতি খবর পাওয়ার পর থেকে সমানে ফোন করে আমাকে সান্ত্বনা দিতে থাকলো। কোনোভাবে যেন ভেঙে না পড়ি সেজন্য দূর থেকে তাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করল। বাবা মারা যাওয়ার চারদিনের দিন লোক খাইয়ে আমি রওনা দিলাম ঢাকায়। আর থাকতে পারছিলাম না। 


ধীরে ধীরে সময় এগিয়ে আসতে থাকলো। আমার ভয়ও বাড়তে থাকলো। সেই ট্রেনযাত্রা আর বাবার মৃত্যুর পর থেকে বেয়াড়া স্বপ্নটা বার বার চোখে ভাসে। বাচ্চাটা আমার থেকে ওরা নিয়ে যাবে ভাবলেই দমবন্ধ লাগে।


এক রাতে ব্যথা উঠল। অনিরুদ্ধ চ্যাটার্জির ঠিক করে দেয়া একটা ভাড়া বাড়িতে থাকতাম আমি তাদের আত্মীয়ার পরিচয়ে। সাথে একটা কাজের মেয়েও ছিল। মেয়েটাই রাতে সবাইকে খবর দিল। হাসপাতালে নেয়া হলো আমাকে।


ব্যথায় মনে হচ্ছিলো মরেই যাব। এ যন্ত্রণা অন্যরকম। চিৎকার করে কাঁদছিলাম। শরীরে ব্যথার সাথে মনের ব্যথাটাও কম ছিল না। পৃথিবীতে আসার সাথে সাথেই বাবু আলাদা হয়ে যাবে আমার থেকে।


অপারেশন টেবিলে আধো জাগরিত অবস্থায় ডাক্তারদের কথা আবছা কানে আসছিলো। শরীরের নিচের অংশ অবশ করে অপারেশন চলছিলো। বুঝতে পারলাম অবস্থা খুব বেশি ভালো নয়। আরেকটা কথা কানে এলো, দু'জনকে বাঁচানো যাবে না হয়তো। 


আমি প্রাণপণে সে মুহূর্তে সৃষ্টিকর্তাকে স্মরণ করতে থাকলাম। আমি যেন মরে যাই, বাচ্চাটা যেন বাঁচে। এর মাঝে কখন জ্ঞান হারিয়েছি জানি না।


আমার জ্ঞান ফিরল দু'দিন পর। সারা শরীর ঝিম ধরে গেছে। বিশ মন হয়ে আছে একেকটা হাত। নার্স আমাকে জেগে উঠতে দেখে এগিয়ে এল। আমি ক্লান্ত গলায় জিজ্ঞেস করলাম, "বাবু কেমন আছে?"

নার্স মৃদু হেসে বলল, "ভালো আছে।"

"সে এখন কোথায়?"

"হাসপাতালেই আছে। আপনি আরেকটু সুস্থ হলে দেখতে দেয়া হবে।"

আমি স্বস্থির নিঃশ্বাস নিলাম। যাক, দেখতে তো পাব!


সেদিন বিকেলে বাবুকে আমার কোলে দেয়া হলো। ছোট্ট একটা মানুষ। ছোট ছোট হাত পা। চোখগুলো বড় বড় করে আমায় দেখছে। বাবু দেখতে তার বাবার মতো হয়েছে। তবে গায়ের রঙ উজ্জ্বল নয়। শ্যামবর্ণ। দেখতে দেখতে সে আমার একটা আঙুল মুঠিতে ধরে ঘুমিয়ে গেল। নিচের থুতনিটা গর্ত হয়ে ভেতরে ঢুকে গেল। কি অপূর্ব মুখ! সারাজনম তাকিয়ে থাকলেও শখ মিটবে না।


সে সময় অনিরূদ্ধ চ্যাটার্জি কেবিনে ঢুকলেন। মুখে ম্লান হাসি। যেন অনেক কষ্টে হাসিটা ধরে রেখেছেন। পাশে টুলে বসে বললেন, "কেমন আছেন?"

আমি বিস্তৃত হাসি দিয়ে বললাম, "ভালো।"

উনি খানিকক্ষণ নিচের দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন, "আপনার সাথে কিছু কথা ছিল।"

"কী কথা?"

"আপনি কি বাচ্চাটাকে নিজের কাছে রাখতে পারবেন? আমি সব খরচ দেব। শুধু আপনি তাকে লালন পালন করে বড় করবেন।"

আমি চূড়ান্ত অবাক হলাম। আবারও ঘুম ঘোরে স্বপ্ন দেখছি কি না ভাবতে বসে গেলাম। কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করলাম, "আমি রাখব কেন?"

উনি ইতস্তত করে উত্তর দিলেন, "আমার স্ত্রী ওকে নিজের সন্তান বলে মানে না।"

"কেন? সম্পূর্ণ ডাক্তারি পদ্ধতিতে সব হয়েছে। তাছাড়া উনি নিজেও রাজি ছিলেন টেস্টটিউব বেবী নিতে।"

"হ্যাঁ। কিন্তু বাবুর মুখ দেখে তার মন ঘুরে গেছে। কে কী বুঝিয়েছে জনি না, কিন্তু সে কিছুতেই বিশ্বাস করে না এই কালো বাচ্চাটা তার নিজের ভ্রূণ থেকে জন্ম নিয়েছে।"

আমার মনে হলো কেউ বুঝি বুকে বিষাক্ত তীর ঢুকিয়ে দিলো। নিষ্পাপ বাবুর মুখের দিকে তাকিয়ে মনে হলো পৃথিবী ছেড়ে চলে যাই ওকে নিয়ে।

উনি বলতে থাকলেন, "বাবু দেখতে আমার মতো হলেও রঙ পেয়েছে ওর দাদার। বিশাখা সেটা কিছুতেই মানবে না। তার ধারনা ওর গায়ের রঙ আপনার মতো হয়েছে।"

অনিরূদ্ধ চ্যাটার্জি মাথা নিচু করে ফেললেন। আমারও ভীষণ লজ্জা হলো। ছি! এমন করে কেউ কী করে ভাবতে পারে!

উনি একটু থেমে থেকে বললেন, "ওকে অনেক বুঝিয়েছি। প্রমাণ দিয়েছি। ও বুঝবে না। বাচ্চাকেও নেবে না। এবার আপনি বলুন, আপনি কি ওকে রাখবেন?"

 

এই অপমানের কথা শোনার পরও বাবুকে পাওয়ার আনন্দে আমার চোখদুটো ঝিকমিক করছিলো। বাবুকে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরলাম আমি। লোকটা যা বোঝার বুঝে গেলেন। নিচু গলায় বললেন, "একবার ওকে আমার কোলে দেবেন?"


আমি বাবুকে দিলাম। বাবুর সত্যিকারের বাবা তাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেললেন। অতিদ্রুত সেই চোখের পানি মুছে বাবুকে আমার কোলে দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। যাওয়ার আগে বললেন, "আমি ওর ভরনপোষণের সব ব্যবস্থা করব। আর একটা কথা, বড় হওয়ার পর ওর সব কাজে যেন বাবার নামের জায়গায় আমার নাম আর মায়ের নামে আপনার নাম থাকে।"


কথাটা বলে উনি দাঁড়ালেন না। আমি প্রচন্ড অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম সেদিকে। বাবুর ঘুম ভেঙে গেছে। আমার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হেসে দিল সে।


আজ অনেক বছর হয়ে গেছে। অনিরূদ্ধ আর বিশাখা চ্যাটার্জির কী হয়েছে আমি জানি না। তাদের সাথে আর দেখাও হয়নি। শুধু মাসের শুরুতে ব্যাংকে মোটা অংকের টাকা সময়মতে পৌঁছে যায়। বাবু এখনো আমার আঙুল ধরে ঘুমায়। মা বলে গলা ফাটিয়ে ডাক দেয়। অকারনে দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরে। তারাভরা রাতে বাবুকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে আমি ভাবি, সৃষ্টিকর্তা আমার কপালে এত সুখ লিখে রেখেছিলেন কেন? ট্রেনের সেই স্বপ্নটা সত্যি হলে কেমন করে? পৃথিবীর জন্য কিছু করতে চাওয়ার বদলে আমি যেন পুরো একটা পৃথিবী উপহার পেয়ে গেছি!


(সমাপ্ত)



▪️

Comments

Popular posts from this blog

আমি চন্দ্রমল্লিকা হবো ____মোশাহেদ চৌধুরী।

কবিতা হোক অমোঘ অস্ত্র ____ বাগবুল মাহবুব

ছুঁয়ে যাক পরলোক। _____বকুল হক।

কোন মায়ার বাঁধনে _____সিরাজুল ইসলাম মোল্লা

মেঘের গল্প ____ডা.অমল কুমার বর্মন

মোঃ ফিরোজ কবির এর এক গুচ্ছ কবিতা

আমিটা ___এম এ হাসান সুইট

আমার প্রণয় ফিরিয়ে দাও --------আরিফুজ্জামান মুঈন

মোঃ মাইদুল ইসলাম এক গুচ্ছ কবিতা।